Header Ads

পশ্চিমবঙ্গের আগামী প্রজন্মের সৃজনশীল একঝাঁক প্রতিভা।

শ্রীজাতা সাহা সাহু: কলকাতা

বয়স তাঁদের ১৮-৩৫-এর মধ্যে, কিন্তু কাজে-কম্মে আর ভাবনা-চিন্তায় তাঁরা সৃজনশীলতার ছাপ ফেলেন প্রতি মুহূর্তে। আমাদের সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা এইসব মানুষগুলি পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তের বাসিন্দা। বর্ধমানের তৌফিক মন্ডল, আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটার সঙ্কেত দাস, আসানসোলের কাছে রূপনারাণপুরের শুভম হেমব্রম, দক্ষিণ ২৪ পরগণার বেহালার বরিষা অঞ্চলের দীপান্বিতা সেন, কলকাতার সুবর্ণা ডি, হুগলীর চুঁচুঁড়ার সোমনাথ বাগ এবং কলকাতায় ফিল্ম নিয়ে লেখাপড়া করতে আসা লাদাখের চাংথ্যাং-এর সোনম নারবু- এঁরা সকলেই সুন্দরের সাধক জন কিটস্-এর দর্শন মেনে চলেন। “সৌন্দর্য্য আনন্দের উৎসব...তার প্রতি আকর্ষণ প্রতি মুহুর্তে বৃদ্ধি পায়; এই সৌন্দর্য্য কখনই অলীক হয়ে যায় না।” কিটস্-এর রচনায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা চলচ্চিত্র এবং অ্যানিমেশনে তাঁদের সৃজনশীল প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। গোয়ায় অনুষ্ঠিত ৫৩তম ভারতের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বা আইএফএফআই-তে দিন কয়েক আগে চলচ্চিত্রোৎসবের পার্শ্ব উপস্থাপনায় তথ্য ও সম্প্রচার এবং যুব বিষয়ক ও ক্রীড়া মন্ত্রী শ্রী অনুরাগ ঠাকুর এঁদের সৃজনশীল প্রয়াসগুলির তারিফ করে তাঁদের সম্বর্ধিত করেন।

বর্ধমান হোলি রক স্কুলের ছাত্র তৌফিক মন্ডলের খেলাধুলায় ঝোঁক বরাবরই। অষ্টম শ্রেণী ঊত্তীর্ণ তৌফিক ইউটিউবে “টেকনিক্যাল গুরুজি”র একটি সাক্ষাৎকার দেখেন। সেখানে র‌্যাপ গানের বিখ্যাত গায়ক হানি সিং-কে সঙ্গীতের নানা বিষয় নিয়ে টেকনিক্যাল গুরুজি প্রশ্ন করেন। হানি সিং জানান, তিনি গান গাইবার সময় এফএল সফ্টওয়্যার ব্যবহার করেন। এই তথ্য জানার পর তৌফিক নিছক কৌতূহলের বশে এই সফ্টওয়্যারের ট্রায়াল ভার্সানটি ইনস্টল করেন। এরপর তিনি ইউটিউব থেকে কি করে সঙ্গীত তৈরি করতে হয় সেটি রপ্ত করেন। বছর খানেক পর লজিকপ্রো সফ্টওয়্যারের সাহায্যে তৌফিক রাতারাতি একটি গানই তৈরি করে ফেলেন।

তৌফিকের সৃষ্টির প্রথম শ্রোতা ছিলেন তাঁর বাবা-মা এবং বন্ধু-বান্ধবরা। এরপর বেশ কয়েক বারের চেষ্টায় তিনি মুম্বাইয়ের হুইসলিং উডস্ ইন্টারন্যাশনাল সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় নাম তুলতে সফল হন। পরবর্তীতে ৭৫জন সৃজনশীল মনন ’৭৫ ক্রিয়েটিভ মাইন্ডস্’ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। তাঁর সৃষ্টির কিছু নমুনা জমা দেওয়ার পর গোয়ায় চলচ্চিত্র উৎসবে পেশাদার এবং ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের ৭৫ জন সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ৭ দিনের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণও পান তিনি। ৫৩ তম ভারতের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে লন্ডনের শর্টস টিভি-র প্রযোজনায় সৃজনশীল এই তরুণ-তরুণীরা একটি চলচ্চিত্র প্রকল্পে একসঙ্গে কাজ করেন। সাফল্যের সঙ্গে প্রকল্পের কাজ শেষ করায় ইফি এবং এনএফডিসি থেকে তাঁদের উৎকর্ষের শংসাপত্র দেওয়া হয়। তৌফিক বর্তমানে আর একটি প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এখন বলিউডের সঙ্গীত জগতে একজন সুরকার হিসেবে কাজ করার স্বপ্ন তিনি দেখা শুরু করেছেন।

কলেজ ছাত্রী দীপান্বিতা সেন চলচ্চিত্র এবং অ্যানিমেশন তৈরির বিষয়ে অত্যন্ত উৎসাহী। তিনি পার্কস্ট্রীটের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে অ্যানিমেশন তৈরির প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ইতোমধ্যেই তাঁর দুটি ছবি “দ্য কিক” এবং “কাপল” বিচারক মন্ডলীর প্রশংসা পেয়েছে। আগামীদিনে আরও বড় কাজ করার স্বপ্ন এখন দীপান্বিতার চোখে।

রুক্ষ পাথুরে লাদাখের ছেলে সোনম নারবু কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউটে চলচ্চিত্র নির্মাণের কোর্স করছেন। পার্বত্য অঞ্চলের জীবনযাত্রা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি তাঁর চারপাশে ঘটে চলা জীবনের বিভিন্ন উপাদান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছেন। চলচ্চিত্রের দৃশ্য নির্মাণের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। সিনেমাটোগ্রাফি ছাড়াও তাঁর স্বপ্ন আগামীদিনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা। ইফি-র দ্বিতীয় “৭৫ ক্রিয়েটিভ মাইন্ডস অফ টুমোরো”-তে তাঁর নির্মিত ছবি “সান বিহাইন্ড দ্য ক্লাউড” প্রশংসিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন ঘটনাবলীর ওপর ভিত্তি করে তিনি এই ছবিটি নির্মাণ করেছেন।

 

ইফি-র তরুণ প্রজন্মকে চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহিত করার একটি উদ্যোগ হল ৫৩ ঘণ্টায় চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিযোগিতা। এনএফডিসি-র সহায়তায় ৫৩ ঘণ্টার মধ্যে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিযোগিতায় “পার্পল টিম” স্থান পেয়েছে। এই দলের সদস্য সোমনাথ বাগ, প্রিয়া রাজ কাপুর পরিচালিত “ডিয়ার ডায়েরি” চলচ্চিত্রের সহকারী পরিচালকের কাজ করেছেন। কলকাতার রূপকলা কেন্দ্রের চলচ্চিত্রে শব্দের প্রয়োগ সংক্রান্ত পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিপ্লোমা পাঠক্রমের ছাত্র সোমনাথ ২০২১ সালে তাঁর “গোবরা” চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি পরিচালক এবং সুরকার হিসেবে কাজ করছেন।

আসানসোলের কাছে রূপনারায়ণপুরের বাসিন্দা শুভম হেমব্রম যদিও বাণিজ্য শাখার একজন স্নাতক কিন্তু ছবি আঁকার উৎসাহ তাঁর ছোটবেলা থেকেই। ২০১৮-১৯ সময়কালে ভারত কলাকেন্দ্র থেকে ছবি আঁকার ডিগ্রি সংগ্রহ করে লকডাউনের সময় শুভমের দিন কাটত বিভিন্ন ধরনের ছবি এঁকে। এরপর তাঁর আঁকাগুলিকে সে ফেসবুকে ও ইন্সটাগ্রামে আপলোড করত। শুভমের ফেসবুক বন্ধুরা তাঁকে অ্যানিমেশন নিয়ে কাজ করতে পরামর্শ দেন। শুভম জাপানিজ অ্যানিমি দেখতে শুরু করেন। তিনি পার্কস্ট্রীটে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে অ্যানিমেশনের কোর্স করেন। এরপর যাযাবর জীবন নিয়ে তাঁর তৈরি অ্যানিমেশন ছবি “মিনা দ্য স্টোরি অফ আ নোমাড লাইফ” ২০২০ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ইউটিউবে প্রকাশিত হয়। বছর খানেক পর এই ছবিটি ভারতের আন্তর্জাতিক স্টুডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ফ্রোমোলজিতে নির্বাচিত হয়। গোয়ায়, এ বছর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে “৭৫ ক্রিয়েটিভ মাইন্ডস অফ টুমোরো”-তে এই ছবিটি জায়গা করে নিয়েছে।

কলকাতার সুবর্না ডি অ্যানিমেশন ছবি বানান নিছক শখে। তাঁর কার্টুন ছবি “অমায়ী”-তে তিনি গ্রামের এক মহিলার কাহিনী তুলে ধরেছেন। এই মহিলার কাজ হল খৎনা করে বেড়ানো। তাঁকে যখন তাঁর মেয়ের খৎনা করতে বলা হয় তখন তাঁর মন তোলপাড় করে ওঠে। নিজের সমাজের সব রীতিনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে সে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়। ২০২১ সালে অ্যানেসি আন্তর্জাতিক অ্যানিমেশন ফেস্টিভ্যাল এবং ক্র্যাকাও চলচ্চিত্র উৎসবে “অমায়ী” বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।

আমাদের এই নিবন্ধের শেষে যার কথা বলবো সে হল সংকেত দাস। উত্তরবঙ্গের ফালাকাটার ছেলে সংকেত অ্যানিমেশন এবং ভিএফএক্স নিয়ে পড়াশোনা করছে। পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের স্নাতক স্তরের ছাত্র সে। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর কাগজে আঁকিবুকি কাটার মধ্যে দিয়ে তার কার্টুনের জগতে প্রবেশ। জাপানিজ অ্যানিমি এবং ডিজনি ক্লাসিক সিরিজ দেখে অ্যানিমেশনের প্রতি তাঁর উৎসাহ বাড়ে। আড়াই বছর ধরে সংকেত তাঁর কার্টুন তৈরির ইচ্ছাকে লালন করেছে। বর্তমানে ত্রিমাত্রিক অ্যানিমেশন পাঠক্রমের সে পড়ুয়া। ইফি-তে “আগামীদিনের ৭৫ জন সৃজনশীল মনন” কর্মসূচিতে সংকেত জায়গা করে নিয়েছে। এছাড়াও, এ বছর ফ্রেমোলজি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও তাঁর ছবি স্থান পেয়েছে।

আমাদের এই গল্প শেষ হবার নয়। গোয়ায় এ বছরের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেশের নানা প্রান্তের ১৯টি রাজ্যের সৃজনশীল তরুণ প্রতিভা তাঁদের সৃষ্টি উপস্থাপনের সুযোগ পেয়েছেন। স্বভাবতই এর মাধ্যমে আরও অনেকে অনুপ্রাণিত হবেন। আগামীদিনে এঁরা যে এঁদের প্রতিভার সাক্ষর বহন করবেন, সেই আশা তো আমরা করতেই পারি। 


No comments

Powered by Blogger.